ads1

সূরা ফাতিহা

 

সূরা ফাতিহা

 

আয়াত: ৭, রুকূ: ১, মাক্কী

আল্লাহর নামে শুরু করছি, যিনি পরম করুণাময় ও অতি দয়ালু।

০১. আল্লাহ্‌র জন্য সমস্ত প্রশংসা যিনি জগতসমূহের প্রতিপালক।
০২. যিনি পরম করুণাময়, অতিশয় দয়ালু।
০৩. যিনি প্রতিফল দিবসের মালিক।
০৪. আমরা শুধুমাত্র আপনারই 'ইবাদত করি এবং আপনারই সাহায্য প্রার্থনা করি।
০৫. আমাদেরকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করুন।
০৬. তাদের পথ, যাদের প্রতি আপনি অনুগ্রহ করেছেন;
০৭. তাদের নয়, যাদের প্রতি আপনার গযব বর্ষিত হয়েছে (ইয়াহূদী), এবং তাদেরও নয় যারা পথভ্রষ্ট (খ্রিস্টান)। 

 

সূরার নাম ও কিছু বৈশিষ্ট্যঃ 

সূরা আল-ফাতিহা-ই সর্বপ্রথম কুরআন মজীদের একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা হিসাবে রাসূলের প্রতি নাযিল হয়েছে। [তাবারী, কাশশাফ, আল-ইতকান] সৰ্বপ্রথম অহীর মাধ্যমে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি যে আয়াত বা সূরার অংশ নাযিল হয় তা হচ্ছে সূরা আল-আলাক’-এর প্রাথমিক আয়াত কয়টি। দেখুন, বুখারী: ৩] সূরা আল-মুদাসসির-এর প্রাথমিক কতক আয়াত এর কিছুদিন পর নাযিল হয়। বুখারী ৪৯২২, ৪৯২৪] কিন্তু এই খণ্ড আয়াতসমূহ নাযিল হওয়ার মধ্যে একটিও পূর্ণাঙ্গ সূরা ছিল না। পূর্ণাঙ্গ সূরা প্রথম যা নাযিল হয়েছে, তা হচ্ছে সূরা আল ফাতিহা। কুরআন মজীদের ১১৪ টি সূরার মধ্যে প্রত্যেকটির জন্য একটি নাম নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এই নামকরণ ব্যাপারে কয়েকটি বিশেষ নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। কোন কোন সূরার নাম রাখা হয়েছে এর প্রথম শব্দ দ্বারা। কোন সূরায় আলোচিত বিশেষ কোন কথা কিংবা তাতে উল্লেখিত বিশেষ কোন শব্দ নিয়ে তা-ই নাম হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। আবার কোন কোন সূরার নামকরণ করা হয়েছে তার আভ্যন্তরীণ ভাবধারা ও বিষয়বস্তুকে সম্মুখে রেখে। কয়েকটি সূরার নাম রাখা হয়েছে কোন একটি বিশেষ ঘটনার প্রতি খেয়াল রেখে। সূরা আল-ফাতিহার নাম রাখা হয়েছে কুরআনে এর স্থান-মর্যাদা, বিষয়বস্তু-ভাবধারা, এর প্রতিপাদ্য বিষয় ইত্যাদির প্রতি লক্ষ্য রেখে। এদিক দিয়ে সূরা আল-ফাতিহার স্থান সর্বোচ্চ। কেননা অন্যান্য সূরার ন্যায় সূরা আল-ফাতিহার নাম মাত্র একটি নয়, অনেকগুলো। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নাম হচ্ছে,

১. “ফাতিহাতুল কিতাব” (فَاتِحَةُ الْكِتَاب) কুরআনের চাবি-কাঠি। কেননা, এই সূরা দ্বারাই কুরআনের সূচনা হয়, কুরআনের প্রথম স্থানেই একে রাখা হয়েছে। কুরআন খুলে সর্বপ্রথম এই সূরা-ই পাঠ করতে হয়। কখনও কখনও এই নামের রূপান্তর হয়ে ফাতিহাতুল কুরআন হয়ে থাকে। এতে অর্থের দিক দিয়ে কোন পার্থক্যই সুচিত হয় না।


২. “উম্মুল কিতাব” (أمُّ الكِتَاب) আরবী ভাষায় ‘উম্ম’ বলা হয় সর্ব ব্যাপক ও কেন্দ্রীয় মর্যাদাসম্পন্ন জিনিসকে। সৈন্য বাহিনীর ঝান্ডাকে বলা হয় উম্ম। কেননা সৈনিকবৃন্দ তারই ছায়াতলে সমবেত হয়ে থাকে। মক্কা নগরের আর এক নাম হচ্ছে, ‘উম্মুল কুরা’-জনপদসমূহের মা। কেননা, হজ্জের মৌসুমে সমস্ত মানুষ-সকল গোত্র ও জাতি এই শহরেই একত্রিত হয়। ইমাম বুখারী কিতাবুত তাফসীর-এর শুরুতে লিখেছেনঃ এর নাম ‘উম্মুল কিতাব’ এজন্য বলা হয়েছে যে, কুরআন লিখতে ও পড়তে তা-ই প্রথম এবং সালাতের কেরাতেও তা-ই প্রথম পাঠ করতে হয়।

৩. “সূরাতুল হামদ” (سُورَةُ الْحَمْد) তা'রীফ ও প্রশংসার সূরা। হামদ এই সূরার প্রথম শব্দ। ইহাতে আল্লাহর হামদ-তা'রীফ-প্রশংসা ও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়েছে, সেই জন্য এটি এ সূরার জন্য যথার্থ নাম।

৪. “সূরাতুস-সালাত” (سُورَةُ الصَّلاة) অর্থাৎ সালাতের সূরা। যেহেতু সব সালাতের সব রাকাআতেই এটি পাঠ করতে হয় সেজন্যই এই নামকরণ হয়েছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, لا صَلاة لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ অর্থাৎ, যে ব্যক্তি নামাযে সূরা ফাতিহা পড়বে না, তার সালাত হবে না। বুখারীঃ ৭৫৬, মুসলিমঃ ৩৯৪]

৫. “আস-সাব'য়ুল মাসানী” (السَّبْعُ الْمَثَانِى )-‘বার বার পাঠ করার সাতটি আয়াত’। সূরা ফাতিহার সাতটি আয়াত রয়েছে এবং তা বার বার পাঠ করা হয় বলে এর আর এক নাম সাব’য়ুল মাসানী। অথবা সালাতের প্রতি রাকাআতেই তা পড়া হয় বলেই এর এই নাম। [আল-কাশশাফ, বাগভী, তাফসীর ইবন কাসীর, আল-ইতকান, আত-তাফসীরুস সহীহ]

আয়াত সংখ্যাঃ

এ ব্যাপারে কারও কোন দ্বিমত নেই যে, সূরা ফাতিহার মোট সাতটি আয়াত রয়েছে। এ জন্য হাদীস শরীফে একে সাতটি পুনরাবৃত্তিমূলক আয়াতের সূরা السَّبْعُ الْمَثَانِى  বলা হয়েছে। [বুখারী ৪৭০৩] পবিত্র কুরআনেও একে এ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। [সূরা আল-হিজরঃ ৮৭] এ কারণে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জেগেছেঃ সূরার পূর্বে যে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” উল্লেখিত হয়েছে তা

আহসানুল বায়ান


[1] সূরা ‘ফাতিহা’ ক্বুরআন মাজীদের সর্ব প্রথম সূরা। হাদীসসমূহে এই সূরার অনেক ফযীলতের কথা এসেছে। ‘ফাতিহা’র অর্থ শুরু ও আরম্ভ। এই জন্যেই এই সূরাকে ‘ফাতিহা’ অর্থাৎ ক্বুরআন গ্রন্থের ভূমিকা বলা হয়। এই সূরার আরো অনেক নাম হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। যেমন, ‘উম্মুল ক্বুরআন’ (ক্বুরআনের মূল), ‘আস্সাবউল মাসানী’ (সাত আয়াতবিশিষ্ট বারবার পঠনীয় সূরা), ‘আল-ক্বুরআনুল আযীম’ (মহাক্বুরআন), ‘আশ্শিফা’ (রোগের প্রতিকার) এবং ‘রুক্ব্য়াহ’ (ঝাড়-ফুঁকের মন্ত্র) ইত্যাদি। ‘আস্স্বালাত’ (নামায)ও এই সূরার একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। যেমন হাদীসে ক্বুদসীতে এসেছে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘‘আমি ‘স্বালাত’ (নামায)-কে আমার ও আমার বান্দার মধ্যে বণ্টন করে দিয়েছি।’’ (সহীহ মুসলিম-কিতাবুস্স্বালাত) এখানে ‘স্বালাত’ বলতে সূরা ‘ফাতিহা’কে বুঝানো হয়েছে। যার প্রথম ভাগে মহান আল্লাহর প্রশংসা-গুণগান, রহমত, প্রতিপালকত্ব এবং তাঁর সুবিচার ও সার্বভৌমত্বের মালিকানার কথা বর্ণিত হয়েছে। আর শেষভাগে রয়েছে দুআ ও মুনাজাত, যা বান্দা আল্লাহর নিকট করে থাকে। এই হাদীসে সূরা ফাতিহাকে ‘নামায’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ থেকে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, নামাযে তা (সূরা ফাতিহা) পড়া অত্যাবশ্যক। তাই নবী করীম (সাঃ)-এর বিবৃতি দ্বারা এটা আরো সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দেওয়া হয়েছে। যেমন তিনি বলেন, ‘‘তার নামায হয় না, যে সূরা ফাতিহা পড়ে না।’’ (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম) হাদীসে مَن (যে) শব্দটি অনির্দিষ্টবোধক যা সকল নামাযীকেই শামিল করে থাকে। তাতে সে একা নামায পড়ুক বা ইমাম হয়ে অথবা ইমামের পিছনে মুক্তাদী হয়ে, চুপিচুপি পড়ুক বা সশব্দে, ফরয নামায হোক কিংবা নফল; সকল নামাযীর জন্য সূরা ‘ফাতিহা’ পড়া অপরিহার্য।

এই অনির্দিষ্ট অর্থবোধক হাদীসের সমর্থন ঐ হাদীসটির দ্বারাও হয়ে যায়, যাতে এসেছে যে, একদা ফজরের নামাযে কিছু সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)ও নবী করীম (সাঃ)-এর সাথে ক্বুরআন পড়ছিলেন। যার কারণে রাসূল (সাঃ)-এর ক্বুরআন পাঠ ভারী হয়ে গেল। নামায শেষে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন যে, ‘‘তোমরাও কি ক্বুরআন পড়ছিলে?’’ তাঁরা বললেন, জী হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন, ‘‘তোমরা এ রকম করবে না, তবে সূরা ফাতিহা অবশ্যই পড়বে। কারণ যে তা (সূরা ফাতিহা) পড়বে না, তার নামায হবে না।’’ (আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী) অনুরূপ আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, ‘‘যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা ছাড়াই নামায পড়ল, তার নামায অসম্পূর্ণ।’’ এই ‘অসম্পূর্ণ’ কথাটি তিনি ৩বার বললেন। আবূ হুরায়রা (রাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করা হল যে, আমরা তো ইমামের পিছনেও নামায পড়ি, তখন আমরা কি করবো? তিনি বললেন, তোমরা তা (সূরা ফাতিহা) ইমামের পিছনে মনে মনে পড়বে। (সহীহ মুসলিম)

উল্লিখিত হাদীস দু’টি থেকে এ কথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ক্বুরআনে যে এসেছে, ‘‘আর যখন ক্বুরআন পাঠ করা হয়, তখন তা মনোযোগ দিয়ে শোন এবং নিশ্চুপ থাক।’’ (আ’রাফ ২০৪ আয়াত) অনুরূপ এই হাদীস (সহীহ হলে) ‘‘যখন ইমাম ক্বুরআন পাঠ করে, তখন চুপ থাক।’’ এর অর্থ হল, জেহরী (সশব্দে ক্বিরাআতবিশিষ্ট) নামাযগুলোতে মুক্তাদী সূরা ফাতিহা ব্যতীত বাকী ক্বুরআন পাঠ নিশ্চুপে শুনবে; ইমামের সাথে ক্বুরআন পাঠ করবে না। অথবা ইমাম সূরা ফাতিহার আয়াতগুলো একটু থেমে থেমে পড়বে যাতে সহীহ হাদীস অনুযায়ী মুক্তাদী সূরা ফাতিহা পড়ে নিতে পারে। কিংবা ইমাম সূরা ফাতিহা পাঠ শেষে এতটা নীরব থাকবে যাতে মুক্তাদী সূরা ফাতিহা পড়ে নিতে পারে। এইভাবে ক্বুরআনের আয়াত এবং সহীহ হাদীসের মধ্যে -আলহামদু লিল্লাহ - কোন বিরোধ থাকবে না, বরং উভয়ের উপর আমল হয়ে যাবে। কিন্তু সূরা ফাতিহা পাঠ নিষেধ হলে প্রমাণিত হবে যে, ক্বুরআনে কারীম এবং সহীহ হাদীসসমূহের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। কাজেই উভয়ের মধ্যে কোন একটির উপর আমল করা সম্ভব। একই সময়ে উভয়ের উপর আমল করা সম্ভব নয় - আমরা এ থেকে আল্লাহর নিকট পানাহ চাচ্ছি। সূরা আ’রাফের আয়াত নং ২০৪-এর টিকা দেখুন! (এ ব্যাপারে আরো অনুসন্ধানের জন্য মাওলানা আব্দুর রাহমান মুবারকপুরী (রঃ) কর্তৃক প্রণীত ‘তাহক্বীক্বুল কালাম’ এবং মাওলানা ইরশাদুল হক আসারী (হাফিযাহুল্লাহ) কর্তৃক প্রণীত ‘তাওযীহুল কালাম’ পুস্তিকা দ্রষ্টব্য) এখানে এ কথাও স্পষ্ট থাকে যে, ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রঃ)র মতে অধিকাংশ সালফে সালেহীনদের উক্তি হল, যদি মুক্তাদী ইমামের ক্বুরআন পাঠ শুনতে পায়, তাহলে পড়বে না। আর যদি না শুনতে পায়, তাহলে পড়বে।

(মাজমুআ ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাঃ ২৩/২৬৫)

[2] এটি মক্কী সূরা। মক্কী অথবা মাদানীর অর্থ হল, যে সূরাগুলো হিজরতের পূর্বে (নবুওয়াতের প্রথম ১৩ বছরের মধ্যে) নাযিল হয়েছে, সেগুলো মক্কী সূরা। তাতে তা মক্কা মুকার্রামায় নাযিল হয়ে থাকুক বা মক্কার আশেপাশে অন্য কোথাও। আর মাদানী হল ঐ সূরাগুলো, যেগুলো হিজরতের পর নাযিল হয়েছে। তাতে তা মদীনায় বা মদীনার আশেপাশে নাযিল হয়ে থাকুক অথবা মদীনা থেকে দূরে কোথাও। এমন কি মক্কা ও তার আশেপাশে কোথাও নাযিল হলেও (তা মাদানী সূরা গণ্য হবে)।

[3] ‘বিসমিল্লাহ’র ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে যে, তা কি প্রত্যেক সূরার সবতন্ত্র একটি আয়াত, নাকি প্রত্যেক সূরার আয়াতের অংশ, নাকি কেবল সূরা ফাতিহার একটি আয়াত, নাকি তা কোন সূরারই সবতন্ত্র আয়াত নয়; কেবল এক সূরাকে অপর সূরা থেকে পার্থক্য করার জন্য প্রত্যেক সূরার শুরুতে তা লেখা হয়েছে? মক্কা ও কুফার ক্বারীগণ তা (বিসমিল্লাহ)-কে সূরা ফাতিহা সহ প্রত্যেক সূরার একটি আয়াত গণ্য করেছেন। পক্ষান্তরে মদীনা, বসরা এবং শামের ক্বারীগণ তাকে কোন সূরারই আয়াত বলে সবীকার করেননি। তবে তা সূরা ‘নামাল’-এর ৩০নং আয়াতের অংশ; এ ব্যাপারে সকলে একমত। অনুরূপ জেহরী নামাযগুলোতে সশব্দে ‘বিসমিল্লাহ’ পড়ার ব্যাপারেও মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ সশব্দে পড়ার পক্ষে। আবার কেউ কেউ চুপিচুপি পড়ার পক্ষে। (ফাতহুল ক্বাদীর) তবে বেশীরভাগ আলেমগণ চুপিচুপি পড়াকে প্রাধান্য দিয়েছেন। পরন্তু সশব্দে পড়াও বৈধ। (বরং সশব্দে পড়ার কোন দলীল সহীহ নয়। দেখুনঃ (সিলসিলাহ যয়ীফাহ ৫/৪৬৮, তামামুল মিন্নাহ ১/১৬৯) সম্পাদক)

Post a Comment

0 Comments