সূরা ফালাক্ব
| قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ | |
| বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি প্রভাতের পালনকর্তার, | |
| مِن شَرِّ مَا خَلَقَ | |
| তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার অনিষ্ট থেকে, | |
| وَمِن شَرِّ غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ | |
| অন্ধকার রাত্রির অনিষ্ট থেকে, যখন তা সমাগত হয়, | |
| وَمِن شَرِّ النَّفَّاثَاتِ فِي الْعُقَدِ | |
| গ্রন্থিতে ফুঁৎকার দিয়ে জাদুকারিনীদের অনিষ্ট থেকে | |
| وَمِن شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ | |
| এবং হিংসুকের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে। | |
সূরা সম্পর্কেঃ
সূরা ফালাক ও পরবর্তী সূরা নাস একই সাথে একই ঘটনায় অবতীর্ণ হয়েছে। ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রাহেমাহুল্লাহ উভয় সূরার তাফসীর একত্রে লিখেছেন। তাতে বলেছেন যে, এ সূরাদ্বয়ের উপকারিতা ও কল্যাণ অপরিসীম এবং মানুষের জন্যে এ দু'টি সূরার প্রয়োজন অত্যধিক। বদনজর এবং সমস্ত দৈহিক ও আত্মিক অনিষ্ট দূর করায় এ সূরাদ্বয়ের কার্যকারিতা অনেক। বলতে গেলে মানুষের জন্যে শ্বাসপ্রশ্বাস, পানাহার ও পোষাক-পরিচ্ছদ যতটুকু প্রয়োজনীয়, এ সূরাদ্বয় তার চেয়ে বেশী প্রয়োজনীয়। সূরা ফালাক-এ দুনিয়াবী বিপদাপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়েছে। পক্ষান্তরে সূরা আন-নাসে আখেরাতের আপদ ও মুসীবত থেকে আশ্রয় প্রার্থনার প্রতি জোর দেয়া হয়েছে। নির্ভরযোগ্য হাদীসসমূহে এ সূরা এবং সূরা আন-নাস উভয় সূরার অনেক ফযীলতা ও বরকত বর্ণিত আছে। উকবা ইবনে আমের রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-এর বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমরা লক্ষ্য করেছ কি, আদ্য রাত্ৰিতে আল্লাহ তা’আলা আমার প্রতি এমন আয়াত নাযিল করেছেন, যার সমতুল্য আয়াত দেখা যায় না; অর্থাৎ (قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ) ও (قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ) আয়াতসমূহ। [মুসলিমঃ ৮১৪] অন্য বর্ণনায় আছে, তাওরাত, ইঞ্জিল, যবূর এবং কুরআনেও অনুরূপ অন্য কোন সূরা নেই। [মুসনাদে আহমাদ: ৪/১৪৮, ১৫৮–১৫৯] এক সফরে রাসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওকবা ইবনে আমের রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করালেন, অতঃপর মাগরিবের সালাতে এ সূরাদ্বয়ই তেলাওয়াত করে বললেনঃ এই সূরাদ্বয় নিদ্ৰা যাওয়ার সময় এবং নিদ্রা থেকে গাত্ৰোত্থানের সময়ও পাঠ করো। [আবু দাউদ: ১৪৬২, মুসনাদে আহমাদ: ৪/১৪৮]
অন্য হাদীসে তিনি প্রত্যেক সালাতের পর সূরাদ্বয় পাঠ করার আদেশ করেছেন। [আবু দাউদ: ১৫২৩ তিরমিযী: ২৯০৩, নাসায়ী: ১৩৩৬, মুসনাদে আহমাদ: ৪/১৫৫] আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন, রাসূলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন রোগে আক্রান্ত হলে এই সূরাদ্বয় পাঠ করে হাতে ফুঁক দিয়ে সর্বঙ্গে বুলিয়ে দিতেন। ইন্তেকালের পূর্বে যখন তাঁর রোগযন্ত্রণা বৃদ্ধি পায়, তখন আমি এই সূরাদ্বয় পাঠ করে তার হাতে ফুঁক দিতাম। অতঃপর তিনি নিজে তা সর্বাঙ্গে বুলিয়ে নিতেন। আমার হাত তাঁর পবিত্ৰ হাতের বিকল্প হতে পারতনা। তাই আমি এরূপ করতাম। [বুখারী: ৫০১৬, মুসলিম: ২১৯২] উকবা ইবনে আমের রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি কি সূরা ইউসুফ ও সূরা হূদ থেকে পড়ব? তিনি বললেন, ‘বরং তুমি কুল আউযু বিরাব্বিল ফালাক দিয়ে পড়। কেননা, তুমি এর চেয়ে আল্লাহর নিকট প্রিয় ও অধিক অর্থপূর্ণ আর কোন সূরা পড়তে পারবে না। যদি তুমি পার, তবে এ সূরা যেন তোমার থেকে কখনো ছুটে না যায়” [মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৫৪০] সারকথা এই যে, যাবতীয় বিপদাপদ থেকে নিরাপদ থাকার জন্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম এই সূরাদ্বয়ের আমল করতেন।
সূরা আল-ফালাক [1]
(মক্কায় অবতীর্ণ)
[1] এর পরবর্তী সূরা হল সূরা নাস। এই দুই সূরার ফযীলত যৌথভাবে একাধিক
হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। যেমন, এক হাদীসে নবী (সাঃ) বলেছেন, ‘‘আজ রাত্রে আমার
উপর কিছু এমন গুরুত্বপূর্ণ আয়াত অবতীর্ণ হল, যা আমি এর পূর্বে কখনো দেখিনি।
এই কথা বলেই তিনি এই দুটি সূরা (সূরা ফালাক ও নাস) পাঠ করলেন। (সহীহ
মুসলিম মুসাফিরদের নামায অধ্যায়, মুআবিবযাতাইন পড়ার ফযীলত পরিচ্ছেদ,
তিরমিযী )
একদা আবু হাবেস জুহ্নী (রাঃ)-কে নবী (সাঃ) বললেন, ‘‘হে আবু হাবেস! আমি তোমাকে উত্তম ঝাড়-ফুঁকের কথা বলে দেব না কি, যার মাধ্যমে আশ্রয় প্রার্থনাকারীরা আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকে?’’ তিনি বললেন, ‘অবশ্যই বলে দিন।’ মহানবী (সাঃ) এই সূরা দুটিকে উল্লেখ করে বললেন, ‘‘এ সূরা দুটি হল মুআবিবযাতান (ঝাড়-ফুঁকের মন্ত্র)।’’ (সহীহ নাসাঈ আলবানী ৫০২০নং)
নবী (সাঃ) মানুষ ও জিনের বদ নজর থেকে (আল্লাহর) নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। যখন এই দুটি সূরা অবতীর্ণ হল, তখন থেকে তিনি ঐ দুটিকে প্রত্যহ পড়ার অভ্যাস বানিয়ে নিলেন এবং বাকী অন্যান্য (দু’আ) বর্জন করলেন। (সহীহ তিরমিযী আলবানী ২১৫০ নং)
আয়েশা (রাঃ) বলেন, যখনই নবী (সাঃ)-এর কোন কষ্ট হত, তখন তিনি মুআবিবযাতাইন (কুবল আউযু বিরাবিবল ফালাক ও ক্বুল আউযু বিরাবিবন্নাস) সূরা দুটি পড়ে নিজ শরীরে ফুঁক দিতেন। যখন (শেষ জীবনে) তাঁর কষ্ট-বেদনা বৃদ্ধি পেল, তখন আমি উক্ত সূরা দুটি পড়ে ফুঁক দিতাম এবং তাঁর হাতের বর্কতের আশা রেখে তা নবী (সাঃ)-এ এর শরীরে ফিরাতাম। (বুখারী, ফাযায়েলে কুরআন, মুআবিবযাত পরিচ্ছেদ, মুসলিম শরীফ সালাম অধ্যায়, মুআবিবযাত দ্বারা রোগীর ঝাড়-ফুঁক পরিচ্ছেদ।)
যখন নবী (সাঃ)-কে যাদু করা হল, তখন জির্রাঈল (আঃ) এই দুই সূরা নিয়ে তাঁর নিকট উপস্থিত হলেন। আর বললেন যে, এক ইয়াহুদী (লাবীদ বিন আ’সাম) আপনাকে যাদু করেছে। আর সেই যাদুর বস্তু যারওয়ান কুয়ায় রাখা হয়েছে। তিনি আলী (রাঃ)-কে পাঠিয়ে তা উদ্ধার করলেন। (তা ছিল একটি চিরুনী, কয়েকটি চুল, একটি সুতো। তাতে দেওয়া ছিল এগারোটি গিরা। এ ছাড়া একটি নর খেজুর গাছের শুকনো মোছা এবং মোমের একটি পুতুল ছিল; যাতে কয়েকটি সুচ ঢুকানো ছিল।) জিব্রাঈল (আঃ)-এর নির্দেশে তিনি উক্ত দুই সূরা থেকে এক একটি আয়াত পাঠ করলেন এবং তার সাথে একটি করে গিরা খুলতে লাগল এবং সুচও বের হতে লাগল। শেষ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছতে পৌঁছতে সমস্ত গিরাগুলি খুলে গেল এবং সুচগুলিও বের হয়ে গেল। এরপর তিনি সঙ্গে সঙ্গে আরোগ্য লাভ করলেন। (সহীহ বুখারী ফাতহুলবারীসহ, তিবব্ অধ্যায়, যাদু পরিচ্ছেদ, মুসলিম সালাম অধ্যায় যাদু পরিচ্ছেদ)
নবী (সাঃ)-এর অভ্যাস ছিল যে, তিনি রাত্রে শয়নকালে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও নাস পাঠ করে দুই হাতের তালুতে ফুঁক মেরে সারা শরীরে ফিরাতেন। প্রথমে মাথা, মুখমন্ডল তারপর শরীরের অগ্রভাগে হাত ফিরাতেন। তারপর যতদূর পর্যন্ত তাঁর হাত পৌঁছত, ততদূর তা ফিরাতেন এবং তিনি এইরূপ তিনবার করতেন। (সহীহ বুখারী ফাযায়েলে কুরআন, মুআবিবযাত পরিচ্ছেদ)
আল্লাহর রসূল (সাঃ) বলেছেন, ‘‘ক্বুল হুওয়াল্লাহু আহাদ, ক্বুল আঊযু বিরাবিবল ফালাক ও ক্বুল আঊযু বিরাবিবন্নাস’ সকাল সন্ধ্যায় তিনবার করে বল; প্রত্যেক জিনিস থেকে তাই তোমার জন্য যথেষ্ট হবে।’’ (আবু দাঊদ, তিরমিযী, নাসাঈ, সহীহ তারগীব ৬৪৩ নং)

0 Comments